কাগজপত্রের ভুলে বিপাকে প্রবাসী

কাগজের ভুলে জীবন বাতিল: প্রবাসী যখন রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ

সংবাদ ২৪ ঘন্টা প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম ৪২ বার পঠিত
কাগজের ভুলে জীবন বাতিল: প্রবাসী যখন রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ

কাগজের ভুলে জীবন বাতিল: প্রবাসী যখন রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
০৫ সেপ্টে ২০২৬
হাতে দুটো কার্ড। এক হাতে বাংলাদেশের পাসপোর্ট, অন্য হাতে স্মার্ট এনআইডি। দুটোতেই একই মানুষের ছবি, কিন্তু দুটো আলাদা জন্মতারিখ, দুটো আলাদা নামের বানান। লোকটা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। এই ছবিটাই আজ বিশ্বের কোটি প্রবাসীর প্রতিচ্ছবি। খবরের শিরোনামে যেটা এখন - "এনআইডি ও পাসপোর্টের তথ্যের গরমিলে চরম ভোগান্তিতে প্রবাসীরা"। প্রকৃত সত্যটা কী? এটা কোনো টাইপিং মিসটেক না। এটা রাষ্ট্রের তৈরি করা একটা ফাঁদ। আজকের এই গরমিলের জন্ম ২০০৫-২০১৫ সালের মধ্যে। তখন হাতে লেখা পাসপোর্ট থেকে MRP পাসপোর্টে রূপান্তর চলছে। এনআইডি সার্ভারের সাথে পাসপোর্ট সার্ভার যুক্ত ছিল না। জন্ম নিবন্ধন দিয়েই পাসপোর্ট হয়ে যেত। একই ব্যক্তি ৫ বছর বয়স কমিয়ে, নামের বানান বদলে পাসপোর্ট পেয়ে গেছে। কেন? এর উত্তর এক প্রবাসী কমিউনিটি নেতার কথায় পরিষ্কার - "বিদেশে যাওয়ার সময় অনেক প্রবাসী দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপে ভুল নাম, বয়স কিংবা জন্মতারিখের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে চলে যান।" দালাল বলেছে বয়স বেশি হলে ভিসা হবে না, তাই ২৬ বছরের যুবক হয়ে গেছে ১৯ বছরের। নামের বানানে একটু এদিক-ওদিক হলে ভিসা আটকায়, তাই মোহাম্মদ হয়ে গেছে মামুন। রাষ্ট্র তখন দেখেও দেখেনি। টাকা দিলেই পাসপোর্ট হয়েছে। রেমিট্যান্স আসলেই হলো। সমস্যা শুরু হয়েছে এখন, যখন ই-পাসপোর্ট করতে গিয়ে সবকিছু এনআইডি সার্ভারের সাথে মেলানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাসপোর্ট অধিদপ্তর নিজেই বলছে, এনআইডির তথ্য না মিললে পাসপোর্ট হবে না। এখানেই কোটি প্রবাসী আটকে গেছে এক ভয়ংকর Catch-22 তে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের পরিপত্র বলছে, এনআইডি ও পাসপোর্টের তথ্যের গরমিল হলে এনআইডিতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পাসপোর্ট রি-ইস্যু করতে হবে। দেশে থাকা মানুষের জন্য এটা সমাধান। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বিদেশে থাকা একজন শ্রমিকের জন্য এটা মৃত্যুদণ্ড। তার গত ১০-১৫ বছরের ওয়ার্ক পারমিট, আকামা, রেসিডেন্স কার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স - সবকিছু তার পুরনো পাসপোর্টের নাম-বয়স দিয়ে তৈরি। সে যদি আজ এনআইডি অনুযায়ী নতুন পাসপোর্ট নেয়, বিদেশের সরকার বলবে - তুমি অন্য মানুষ। তোমার সব বৈধ কাগজ বাতিল। আবার যদি পুরনো পাসপোর্ট আঁকড়ে থাকে, বাংলাদেশ দূতাবাস বলবে - তোমাকে পাসপোর্ট দেব না। ফলাফল? সে অবৈধ হয়ে যাচ্ছে। পাসপোর্ট রিনিউ হচ্ছে না, দেশে আসতে পারছে না, আবার বৈধভাবে থাকতেও পারছে না। দেশে ফিরে ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ, ই-পাসপোর্ট নবায়ন, ব্যাংক হিসাব খোলা কিংবা জমি বেচাকেনার মতো মৌলিক সেবা নিতে গিয়ে আটকে যাচ্ছেন প্রবাসীরা। প্রশ্ন হলো, দোষটা কার? যে লোকটা দালালের কথায় বয়স কমিয়েছে, সে অপরাধী? নাকি যে রাষ্ট্র তাকে ভুয়া কাগজে বিদেশে পাঠিয়ে বছর বছর রেমিট্যান্স গুনেছে, সে অপরাধী? রাষ্ট্র এখন প্রবাসীকে বলছে, যাও এনআইডি ঠিক করে আনো। কিন্তু এনআইডি ঠিক করা মানে নির্বাচন কমিশনে মাসের পর মাস ঘোরা। বহু প্রবাসী মাসের পর মাস ঘুরেও এনআইডি সংশোধনের কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। কারণ ইসি চায় এসএসসি সার্টিফিকেট, বাবা-মায়ের এনআইডি, চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ন - যা একজন ১০-১৫ বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা মানুষের পক্ষে জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ পর্যন্ত - যারা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তাদের কাগজের একটা অক্ষরের ভুলে আপনি তার পুরো জীবনটাকে বাতিল করে দিচ্ছেন। এটা সংশোধন নয়, এটা শাস্তি। সমাধান কঠিন নয়, সদিচ্ছা দরকার। প্রথম, প্রবাসীদের জন্য এককালীন বিশেষ ক্ষমা বা "Truth Window" দিতে হবে। সে বিদেশে যে নাম-বয়সে বৈধভাবে কাজ করছে, তার বিদেশি ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, রেসিডেন্স কার্ড যাচাই করে এনআইডি সংশোধনের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমনটা প্রবাসীরা নিজেরাই দাবি করছেন - "প্রকৃত পরিচয় ও বিদেশের বৈধ নথিপত্র যাচাই করে প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের জন্য বিশেষ ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।" দ্বিতীয়, দূতাবাসে এনআইডি সংশোধন সেল চালু করুন। মানুষকে দেশে পাঠাবেন না। প্রবাসেই বায়োমেট্রিক যাচাই করে সমাধান দিন। তৃতীয়, পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও ইসির ডাটাবেজের যুদ্ধ বন্ধ করুন। একজন মানুষকে দুটো সংস্থার কাছে দুই রকম প্রমাণ দিতে হবে কেন? একজন প্রবাসী পাসপোর্টে ভুল করেনি, সে বাঁচার জন্য আপস করেছে। রাষ্ট্র তখন সেই আপসে সায় দিয়েছে। আজ রাষ্ট্র যদি ধোয়া তুলসী পাতা সাজে, তাহলে সেই পরিবারগুলোর দায় কে নেবে যাদের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ, কিন্তু পরিচয় নেই? তথ্যের গরমিলে ভোগান্তি নয়, রাষ্ট্রের অবহেলায় ভোগান্তি - এই সত্যটা স্বীকার না করলে, স্মার্ট বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্মার্ট কার্ডটাই প্রবাসীর গলার ফাঁস হয়ে থাকবে।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।